‘১০ নভে. ’৮৩– শোক-স্মরণের আবহে সংগ্রামী ধারা পরিত্যাগ : ‘বন, আর ন কান্দ!’ (দোস্ত, আর কেঁদো না!)

0
18


।। 
সত্যদর্শী ।।

(৯ নভেম্বর ২০২১)

(১)

পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই সংগ্রামের এক পর্যায়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে (‘লাম্বা-বাদি’ দ্বন্দ্ব বলে খ্যাত) ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তা ৩৮ বছর হতে চলল।

‘১০ নভেম্বর’ ঘনিয়ে এলে মৌসুমী ব্যবসায়ীর মতো চিহ্নিত একশ্রেণীর লোকের তৎপরতাও বেশ লক্ষ্যণীয়। অনুকরণ সর্বস্বতার বশে ১০ নভেম্বর দিনটিতে ‘প্রভাত ফেরি’ও করতে দেখা যায়, যা আসলে করা হয়ে থাকে ‘৫২ সালের ভাষা শহীদদের স্মরণে। অন্য কোন জাতীয় নেতা বা বীর শহীদের স্মরণে কোথাও ‘প্রভাত ফেরি’ হয় না, তার প্রয়োজনও নেই। জাতীয় নেতা ও বীর শহীদদের একুশে ফেব্রুয়ারির অনকুরণে সম্মান জানাতে হবে কেন?

ভুলে গেলে চলবে না পার্বত্য চট্টগ্রামের লড়াই সংগ্রামে লারমার একনিষ্ঠ অনুসারী আরও অনেকে শহীদ হয়েছেন। তাদের মধ্যে সততা, সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য কয়েক জন হলেন বেশ উঁচু মাপের এবং তারাও আন্দোলনের ইতিহাসে স্থান পাবার যোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। লারমা ছিলেন তাদের অগ্রণী, এজন্য তিনি উচ্চ সম্মান পাবেন।

এদেশের মার্কা মারা ব্যক্তিদের পত্র-পত্রিকায় প্রয়াত লারমার ব্যাপারে সাক্ষাতকার-লেখালেখি চোখে পড়লেও লারমার সহযোগী যারা বীরত্বপূর্ণ আত্মবলিদানের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাদের ব্যাপারে তেমন কিছু উল্লেখ থাকে না। এ ব্যাপারে জেএসএস-এর ভূমিকা বলতে গেলে নিষ্পৃহ।

যা কিছু লেখালেখি হয়, তাতে লারমার জীবন বৃত্তান্ত ও তার পারিবারিক পরিচিতির বয়ান বেশি লক্ষ করা যায়।

কেন লারমাকে লোকে স্মরণ করে ও সম্মান জানায়, জনগণের জন্য তার অবদান ও ভূমিকা কোন ক্ষেত্রে– সেটা নির্মোহ ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে এত বছরেও আলোচনা হয় নি। সেটা না হওয়ায় লাভ হয়েছে সমাজের একশ্রেণীর লোকের। এরা প্রয়াত লারমাকে নিজেদের স্বার্থে ও প্রয়োজনে সুবিধা মতো ব্যবহার করে ফায়দা লুটছে। আলোচ্য নিবন্ধে মূলত এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রতি আলোকপাত করা হবে। লারমার সামগ্রিক জীবন ও কর্মকাণ্ড তুলে ধরা এর উদ্দেশ্য নয়।

(২)

লারমার ‘অনুসারী’ ‘উত্তরসূরী’ সেজে তাকে স্মরণ ও সম্মান জানানোর উছিলায় অতি উৎসাহী একশ্রেণীর লোক যা যা কাণ্ড করে চলেছে, তাতে তারা প্রয়াত লারমাকে খেলো বানিয়ে তার সম্মানের মূল আসনটিকেই ধসিয়ে দিচ্ছে, যা পীড়াদায়ক ও নিন্দনীয়।

লারমার ‘উত্তরসূরী’দের ব্যাপারেও জনমনে নানা প্রশ্ন আছে। লারমার হত্যাকারী বলে প্রীতিগ্রুপকে গালমন্দ করা হলেও ঘটনার সময় কার কী ভূমিকা ছিল, প্রকৃত ঘটনাবলী জানার প্রয়োজনেও এসব আলোচনা হওয়া উচিত। রূপায়ন দেওয়ানের ভাষ্য অনুসারে, জেএসএস-এর সদর দপ্তরে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত উষাতন তালুকদার (সহ-সভাপতি ও সাবেক সাংসদ) নির্দিষ্ট সময়ে ঘাঁটিতে ফেরেন নি, এত বড় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অবহেলা করেন। অন্যদিকে প্রণতি বিকাশ চাকমা ওরফে ভিক্টর বাবু (বর্তমান সাধারণ সম্পাদক) হামলার সময় অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালিয়েছিলেন। সৈন্যবাহিনীতে এমন অপরাধে অভিযুক্তদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার নিয়ম নেই। জেএসএস এখন এ ধরনের নেতা-কর্মীদের দখলে, তারাই লারমার একনিষ্ঠ “অনুসারী”!

নীতি ও পলিসির ব্যাপারে লারমার সাথে ভিন্নমত থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিগণ তার অবদান স্বীকার করেন। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, ফৌজী শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৮৫ সালের ১০ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়াত লারমার স্মরণে প্রথম শোকসভা হয়।[1] সেটি হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষের কয়েক জন অগ্রণী ছাত্রের উদ্যোগে। জেএসএস সংগঠনের বাইরে সাধারণের মধ্য থেকে সেটি ছিল লারমার স্মরণে আয়োজিত প্রথম সভা। সে সময় লারমার নাম নেয়াও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি ছিল সর্বত্র। এ যাবৎ উক্ত সভার কথা কোথাও কোন আলোচনায় উত্থাপিত হয়নি।

যাইহোক, ইউপিডিএফ লারমার প্রত্যক্ষ অনুসারী দল না হলেও একজন সংগ্রামী নেতা হিসেবে তারা লারমার অবদান অস্বীকার করে না। আগে ইউপিডিএফ লারমার স্মরণে সভা করতো, তার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে সম্মান জানাতো।  দ্বিধা-বিভক্তির পূর্বে জেএসএস লারমাকে তাদের নেতা, তাদেরই রয়েছে লারমার ব্যাপারে একমাত্র অধিকার–এমনই ছিল তাদের মনোভাব। অন্য কেউ ‘লারমার সুনামের ভাগ বসাচ্ছে কিনা’ সে ব্যাপারে তারা ছিল ভীষণ শঙ্কিত। ‘৯৭ ও ‘৯৮ সালে পর পর ইউপিডিএফ-এর আহুত লারমার স্মরণ সভায় জেএসএস কর্তৃক বাধাদান, হামলা ও নেতা-কর্মীদের পুলিশের নিকট ধরিয়ে দেয়া এবং “লারমার সুনাম থেকে ভাগ বসানোর অপচেষ্টা”– ইত্যাদি অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় ইউপিডিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে নিজ সংগঠনে লারমার স্মরণে কোনো ধরনের সভা ও অনুষ্ঠান না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর থেকে ইউপিডিএফ লারমার ব্যাপারে মৌণব্রত পালন করে আসছে, কোন প্রোগ্রাম দেয়নি। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও নেতা হিসেবে ইউপিডিএফ লারমাকে মূল্যায়ন করে নৈর্ব্যক্তিকভাবে। কিন্তু লারমার রাজনৈতিক সুনাম থেকে ফায়দা লোটার মতলববাজিতে কখনেই লিপ্ত হয় না, কালের পরিক্রমায় তা সবার কাছে প্রতিভাত হবে।

(৩)

১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর প্রীতিগ্রুপ লারমাকে হত্যা করেছিল, সেটা ছিল শারীরিকভাবে হত্যা। তার জন্য প্রীতিগ্রুপকে লোকে কম নিন্দা ও ধিক্কার জানায়নি, এখনও জানায় আর সেটা তাদের প্রাপ্যও। কিন্তু পরবর্তীকালে লারমাকে হত্যায় নেমেছে শাসকগোষ্ঠী (যার বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন) এবং এ হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে খোদ লারমার ‘অনুসারী’ ‘উত্তরসূরীরাই’ (যারা তার নামে জয়ধ্বনি দেয়), সেটা তারা করছে আদর্শিকভাবে! প্রতি ‘১০ নভেম্বর’ দিনে মহা ধুমধামের সাথে তা তারা করে চলেছে!! এ নিয়ে যতটা সরব হওয়া দরকার, নিন্দা সমালোচনা করা উচিত, তা দেখা যায় না। আসলে এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সাধারণ লোকের ধারণা নেই। এমনকী যারা লারমার কথিত ‘উত্তরসূরী’ তাদেরও এ ব্যাপারে মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

এ প্রসঙ্গে প্রয়াত বিপ্লবীদের ব্যাপারে বুর্জোয়া শাসকচক্রের অনুসৃত নীতি সম্পর্কে মহামতি লেনিনের মন্তব্য বেশ প্রণিধানযোগ্য। ভবিষ্যত দ্রষ্টার মতোই যুগে যুগে লেনিনের এ মন্তব্য সত্য বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। খানিকটা দীর্ঘ হলেও শাসকচক্রের কূট-কৌশল বোঝার জন্য লেনিনের এ মন্তব্য জেনে রাখা প্রতিটি বিপ্লব আকাঙ্ক্ষী কর্মীর জন্য অত্যন্ত অত্যাবশ্যক ও গুরুত্বপূর্ণ।

লেনিন তার বিখ্যাত বই ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’-এ বলেছেন, ‘বিপ্লবীদের জীবদ্দশায় নিপীড়ক শ্রেণী (শাসকগোষ্ঠী) তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়; তাদের শিক্ষার (প্রদর্শিত পথের) প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত বৈরিতা ও হিংস্র ঘৃণা প্রকাশ করে এবং নির্বিচারে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও কুৎসার অভিযান চালায়। মৃত্যুর পর এই সব বিপ্লবীদের নিরীহ দেব-বিগ্রহে (harmless icons) পরিণত করার, সাধু সিদ্ধপুরুষ রূপে গণ্য করার চেষ্টা হয়ে থাকে; নিপীড়িত শ্রেণীর ‘সান্ত্বনা’র জন্য এবং তাদের প্রতারণার উদ্দেশ্যে এই সব বিপ্লবীদের নামের সাথে একটা জৌলুস জুড়ে দেয়া হয়; সেই সঙ্গে তাদের বৈপ্লবিক মতবাদের মর্মবস্তুকে ছেঁটে দিয়ে তাকে নির্বীর্য খেলো করা হয়, তাদের বিপ্লবী তীক্ষ্মতা ভোঁতা করে দেয়া হয়।

লেনিন আরও বলেছেন, তারা (শাসকগোষ্ঠী) মার্ক্সীয় শিক্ষার (মানে সংগ্রামের) বৈপ্লবিক মর্মকেই পরিহার করে, মুছে ফেলে ও বিকৃত করে। বুর্জোয়া শ্রেণীর (শাসকগোষ্ঠীর) নিকট যতটুকু সুবিধেজনক ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে বলে তাদের মনে হয়, ততটুকুই মাত্র এরা প্রকাশ্যে তুলে ধরে ও জোর গলায় তার প্রশংসা করে।’

এদেশের শাসকগোষ্ঠীর দিকে তাকালে এর সত্যতা বলতে গেলে শতভাগ মিলে যায়। বাংলাদেশে শাসকশ্রেণীর বিশেষত: আওয়ামী ঘরণার (এরা সবচে’ ধূর্ত প্রকৃতির) সাংবাদিক-লেখক-বুদ্ধিজীবী-সাংস্কৃতিক ও এনজিও কর্মী এবং আওয়ামী ঘেঁষা এক সময়ের বাম প্রগতিশীল নেতা.. লারমাকে স্বীকৃতি দিতে স্মরণসভা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে যে ধরণের অভাবনীয় কথাবার্তা বলে থাকে, তাতে সাধারণ মানুষের চক্ষু চড়ক গাছ হবে। আওয়ামী নেত্রী বেগম সাজেদা চৌধুরী ঢাকার আগরগাঁওয়ের এক মিলনায়তনে প্রয়াত লারমার ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দাদা বড় ভালো ছিলেন!!!’ আজ লারমা মৃত, সরকারের ক্ষতির কারণ নন, তাই এত প্রশংসা! আসল কথা হচ্ছে, সাজেদা চৌধুরী গঙরা (পঙ্কজ ভট্টাচার্য, মেনন, ইনু…রসুনের মতো এদের শিকড় এক জায়গায়) এসব কথাবার্তা বলে ও কাজ-কারবার করে, তাদের প্রয়োজনেই।

লারমাকে সম্মান জানানোর উছিলায় পাহাড়ি দরদী সেজে তারা যা করেছে, করে চলেছে, তা প্রকৃত বন্ধু কেউ করতে পারে না। এদিক দিয়ে পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে লক্ষ করার মতো।  বলতে গেলে আঠার মতো তিনি জেএসএস-এর সাথে লেগে আছেন, সব ব্যাপারেই জেএসএস-কে সমর্থন দেন।  মনে হতে পারে তিনি বুঝি পাহাড়িদের লড়াইয়ে সাথে আছেন। আসলে তার অবস্থা তো ‘মাঝিহীন ছেঁড়া পালের নৌকার মতো’ ন্যাপ-গণফোরাম… ছেড়েছেন।  কথায় বলে, ‘ডুবন্ত লোক কাউকে তুলতে পারে না’। ২০১২ সালে রাঙ্গামাটিতে সাম্প্রদায়িক হামলার সময় তার ভূমিকা ছিল ন্যাক্কারজনক। যারা পাহাড়িদের পক্ষে নিষ্ঠার সাথে লড়াই করছে, তাদের বিরুদ্ধে তিনি বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে নিজের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। পাহাড়িদের আরও বড় ক্ষতি না করে বোধহয় তিনি ক্ষান্ত হবেন না! পঙ্কজের মতো আরও কয়েক জন মার্কা মারা এনজিও কর্মীকেও দেখা যায়, অভিজ্ঞমহল তাদের উদ্দেশ্য ও ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান।

অন্যদিকে মেনন-ইনুর ভূমিকা হচ্ছে ‘বরের ঘরের পিসি, কনের ঘরে মাসির’ মতো। নিপীড়িতদের পক্ষে কথা বলেন, তাদের দাবি-দাওয়া সমর্থন করেন। অথচ ‘বাঙালি জাতীয়তা’ চাপিয়ে দেয়ার বিতর্কিত ‘পঞ্চদশ সংশোধনী আইন’ পাস করতে সংসদে টেবিল চাপড়িয়ে সরকারকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এরপরও তারা পাহাড়ি দরদী।!‘লারমাকে’ স্মরণ করে তারা দু’এক কথা বললে তাতে গদগদ হয়ে একশ্রেণীর লারমার নব্য অনুসারী যেভাবে মাতামাতি করে, যেন তারা বিশ্বকাপে জিতেছে এমন ভাব দেখায়, তাতে তাদের নির্লজ্জ দেউলিয়াপনাই প্রকাশ পায়।

লারমাকে প্রশংসার ক্ষেত্রে আরেক অগ্রণী হলেন মার্কা মারা আবুল মকসুদ (প্রয়াত) নামের এক সাংবাদিক, যিনি লারমাকে “উগ্রপন্থায় পা না বাড়ালে, জাতীয় নেতা হতে পারতেন!” (২০০৭ সালে লারমা স্মরণে প্রকাশিত পুস্তিকা) বলে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। অর্থাৎ তার নিগুঢ় অর্থ হচ্ছে, আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে সরকারের (যা ’৭৫-এর অবৈধ ফৌজী সরকার) বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়াটা হচ্ছে “উগ্রপন্থা”, যা গ্রহণযোগ্য নয়, নিন্দনীয় ও পরিত্যজ্য! আন্দোলন সশস্ত্র প্রতিরোধ নয়; সরকার শাসকগোষ্ঠীর অনুগ্রহভাজন হয়ে থাকা, “আবেদন নিবেদন”-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকাটাই হচ্ছে বাহবা লাভের যোগ্য কাজ! এটাই চান সাংবাদিক আবুল মকসুদ, তার নিবন্ধে সেটাই তিনি বুঝিয়েছেন। যে আত্মত্যাগ ও মহান ভূমিকার কারণে লারমা পাহাড়ি জনগণের কাছে সম্মানিত, তাকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। একেই বলে, ‘মাথায় তুলে আছাড় মারা’। আবুল মকসুদ পুরানা সাংবাদিক মুন্সিয়ানার সাথে সে কাজটা করেছেন। অথচ তার সে বিতর্কিত নিবন্ধ পুস্তিকা আকারে ছেপে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিল জেএসএস (সন্তু)।  সেটা কি তারা বুঝে করেছিল, নাকি পর্দার আড়ালে কারোর চাপে পড়ে করেছিল, তা অনুসন্ধানীমূলক প্রতিবেদন বেরুলে জানা যাবে।

লারমা বেঁচে থাকলে এমন আপত্তিকর কথা কি মেনে নিতে পারতেন? তিনি নেই, তাকে নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে, তিনি যা বলেননি, তা-ই তার নামে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে! যা তিনি চান নি, সেটাই “লারমার স্বপ্ন” (“বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন” অনুকরণে)– বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে!!! ‘পার্বত্য চুক্তি লারমার স্বপ্ন”– এ ধরনের ক্যাপশনে কুপন ছেপে অনুষ্ঠানের জন্য চাঁদাও সংগৃহীত হয়েছে। লারমা আদৌ কি ‘পার্বত্য চুক্তি’র মতো একটি অসম্পূর্ণ চুক্তি মেনে নিতে পারতেন? সন্তু লারমা তো চুক্তি নিয়ে প্রায়ই হতাশা প্রকাশ করেন। আর রামেন্দু শেখর দেওয়ান (কিছু কাল আগে নিভৃতে তার জীবনাবসান হয়) ‘পার্বত্য চুক্তি’ স্বাগত জানান নি, দেশেও ফেরেননি, নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। জানা যায় চুক্তি’র ব্যাপারে তিনি সন্দিহান ছিলেন। তাহলে ‘পার্বত্য চুক্তি লারমার স্বপ্ন’ বলে প্রচার করাটার মানেটা কী?

প্রয়াত লারমাকে নিয়ে যারা এ সমস্ত কাজকারবার করে চলেছে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে তারা বেশির ভাগই ‘হাইব্রিড’ টাইপের। প্রকৃত আন্দোলনের সময় অর্থাৎ যখন সশস্ত্র আন্দোলন ও বাইরের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তুঙ্গে, সে সময়ে যারা ছিল একশ’ হাত দূরে। চাকরি মিলবে না, অথবা চাকরি খোয়া যাবে… এই কারণে আন্দোলন সংগ্রাম ছিল তাদের নিকট ভীতি উদ্রেককারী ব্যাপার ও বড় অপছন্দের বিষয়, সমাজে এমন ধরণের সুবিধাবাদী আত্মসিদ্ধিপরায়ন বিতর্কিত, বিভিন্ন সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত-দলচ্যুত এমন ধরনের দেউলিয়া প্রকৃতির লোক এ কাজে হামলে পড়েছে। তারাই মহা উৎসাহের সাথে ‘১০ নভেম্বর’কে শোকের পরিবর্তে নিজেদের পুনর্বাসনের সহায়ক হিসেবে লুফে নিয়েছে। ‘১২ জুন কল্পনা অপহরণ’ দিনেও এরা তাই করে থাকে। এতে তাদের লাভ বহুমুখী মিডিয়ায় প্রচার পায়, জেএসএস-এর নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়, অতি সহজ পন্থায় দেশপ্রেমিক সাজা যায় (কাল ব্যাজ  ধারণ, লারমার বেদীতে ফুল দেয়া)। লারমাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ ও গুণকীর্তনমূলক এমন এমন কাহিনী তারা ফেঁদে বসে, কেউ কেউ আবেগের আতিশয্যে কবিতা, গানও রচনা করে থাকে, মানের বিচারে সে সবের বালাই নেই। এ দিক দিয়ে জেএসএস (লারমা) যারা ‘সংস্কার’ নামে পরিচিত তারা খেই হারিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। লারমার স্মরণে প্রকাশিত তাদের ‘প্রবাহন’ নামের স্মরনিকায় লারমাকে নয়, তারা উর্ধ্বে তুলে ধরে তপন জ্যোতি চাকমা (বর্মা)-কে! কোথায় লারমা, আর কোথায় বর্মা?!?

একজন হলেন জেএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা, সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের জন্য সম্মানিত ব্যক্তি, আন্দোলনের পথ প্রদর্শক। আর অন্য জন হলেন নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি ও সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সাথে যোগসাজশের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ইউপিডিএফ থেকে বহিঃষ্কৃত।  এমন এক খলচরিত্রের জীবন বৃত্তান্ত তুলে ধরে তাকে “আদর্শস্থানীয় নেতা” হিসেবে জেএসএস লারমাগ্রুপ জনগণের নিকট উপস্থাপন করেছে।  তাতে তারা নিজেরাই উলঙ্গ হয়ে পড়েছে। বুঝতে বাকী থাকে না তারা ‘একই গোয়ালের গরু’। বর্মাই হলেন তাদের আসল নেতা, অনুসরণীয় ব্যক্তি।  শত্রুর যোগসাজশে নিকৃষ্ট কাজে লিপ্ত এমন ব্যক্তির সাথে এক কাতারে ফেলে, তারা লারমাকে যারপরনাই অপদস্থ করেছে, যা শত্রুপক্ষও করে নি। প্রথম দিকে লারমার নামে জয়ধ্বণি দিয়ে তার আদর্শ বাস্তবায়ন করবে ভাব দেখিয়েছিল; সংগঠনের সাথে জুড়ে দিয়েছিল লারমার নাম। এ ধরনের “উত্তরসূরী” থাকলে, আর শত্রুর দরকার নেই!!! এরাই লারমার জয়ধ্বণি দিয়ে তাকে আদর্শিকভাবে হত্যা করে চলেছে। 

(৪)

লক্ষ করলে আরও দেখা যায়, এমনভাবে গুণকীর্তন চলে যাতে লারমার সংগ্রামী প্রতিবাদী ধারাটিই আড়াল হয়ে পড়ে। ‘লারমা অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন, পিঁপড়াও মারতেন না’—এমন প্রচারণাও সামনে নিয়ে আসা হয়। তিনি ধার্মিক ছিলেন বৈ কি। কিন্তু সেটা তার কাজকর্মের খণ্ডিত অংশ মাত্র। মনে রাখতে হবে, সে কারণে লোকে লারমাকে স্মরণ করে না, সম্মান জানায় না।

একজন ‘সংগ্রামী ব্যক্তি’ ‘ধার্মিক’ হতে পারেন না, এমন নয়। কিন্তু পার্থক্য আছে। লক্ষ করে দেখা যাবে, সমাজে আরও অনেক ধার্মিক ব্যক্তি আছেন, তারাও কোন প্রাণী হত্যা করেন না, পিঁপড়ে কেন কোন ধরনের ইতরপ্রাণী মারতে দেন না। এমন ধার্মিক ব্যক্তিরাও সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত, তারা লোকের নিকট সাধু সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেও পরিচিত। কিন্তু জাতীয় অস্তিত্ব ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ-ভূমিকা না থাকার কারণে সভা-সমাবেশে তাদের স্মরণ করা হয় না।

‘ধার্মিক’ ও ‘সংগ্রামীর’ পার্থক্য না বুঝে গুলিয়ে ফেললে তাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে, লাভ হবে শাসকগোষ্ঠীর। শাসকগোষ্ঠী চায় লোকজন সংগ্রামের পথে পা না বাড়াক, সরকারি ভাষ্যমতে সেটা হচ্ছে “উগ্র পন্থা”!!! আবুল মকসুদরাই দরদীর বেশে জেএসএস-এর কাঁধে ভর করে শাসকগোষ্ঠীর প্রচারণা দক্ষতার সাথে চালিয়েছে! তিনি প্রয়াত, কিন্তু সরকারি প্রচারণা থেমে নেই। তার জায়গায় নামবেন অন্য জন। দুঃখজনক হলেও এদিক দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর লক্ষ্যের সাথে জেএসএস-এর প্রচারণার অদ্ভূত মিল পাওয়া যায়। এভাবে চললে লারমার সংগ্রামী ভূমিকা আড়াল হয়ে যাবে, তার ধার্মিক পরিচিতি মুখ্য হয়ে উঠবে। সে রকম পরিস্থিতিতে লারমা থেকে নতুন প্রজন্মের তেমন কিছু শেখার থাকবে না। কারণ ধর্ম শিক্ষার জন্য তো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, আরও অনেক জ্ঞানী-গুণী ধর্মীয় গুরু রয়েছেন। ধার্মিক হিসেবে নয়, লোকে লারমাকে একজন সংগ্রামী নেতা হিসেবে পেতে চেয়েছিল। লারমার সংগ্রামী ও প্রতিবাদী ভূমিকা গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মীয় আচার পালনের বিষয়াদি মুখ্য করে তুলে ধরলে, তা শাসকগোষ্ঠীরই লক্ষ্য সিদ্ধির সহায়ক হবে। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে নতুন প্রজন্ম ধাঁধায় পড়ে, আসল করণীয় নির্ধারণ করতে পারবে না।

(৫)

লারমাকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে ’৭০ ও ’৭৩ সালে সাংসদ হবার পরিচিতিও তুলে ধরা হয়। মনে রাখতে হবে, লারমাকে সম্মান জানানো ও স্মরণ করার প্রধান কারণ তার দু’বার সাংসদ হওয়া নয়।  

লারমার আগেও সংসদে জনপ্রতিনিধি ছিলেন, পরেও হয়েছেন।  তাদের সাথে লারমার পার্থক্য হচ্ছে এই, গণরায় পেয়ে তিনি বিশ্বস্ততার সাথে জনগণের পক্ষে কথা বলেছেন, অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কঠিন সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করতে দ্বিধা করেননি। 

’৫৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথম নির্বাচনে এ অঞ্চল থেকে প্রথম জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন কামিনী মোহন দেওয়ান ও বীরেন্দ্র কিশোর রোয়াজা। প্রথম জন ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম গণসংগঠন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসমিতির’ সভাপতি এবং দ্বিতীয় জন বর্তমান জনসংহতি সমিতির (জেএসএস)-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি (লারমা ছিলেন প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক)। সংগঠনের প্রধান দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থাকলেও কামিনী মোহন দেওয়ান ও বীরেন্দ্র কিশোর রোয়াজা জনগণের অধিকার আদায়ে লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হন নি, তখন অবশ্য সংগঠন ও সংগ্রাম বিকশিত হয়নি, তারা আত্মোৎসর্গও করেননি।  

এদিক থেকে ব্যতিক্রম হলেন লারমা।  জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে যারা জনগণের বিশ্বস্ত থেকেছেন, এমন ব্যক্তিদের তালিকায় আসবে চাথোয়াই রোয়াজার নাম, লারমার সাথে একই সময়ে সাংসদ হয়েছিলেন। সহযোগী হয়ে লারমার নীতি ও কর্মসূচি সর্বান্তকরণে সমর্থন দিয়ে তিনি ইতিবাচক অবদান রেখেছেন। তার পরে উল্লেখ করা যেতে পারে উপেন্দ্রলাল চাকমার নাম। ‘৮৯ সালে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়ে তিনি শরণার্থীদের মুখপাত্র হয়ে সংগ্রাম করেছেন এবং কঠিন জীবন কাটিয়েছেন। ‘৮০ সালের কলমপতি হত্যাকাণ্ডে জোরাল প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, সেজন্য তার নামও গুরুত্বের সাথে উল্লেখিত হবে।  

চাথোয়াই রোয়াজা ও উপেন্দ্রলাল চাকমার মতো পরিণত বয়সে লারমার মৃত্যু হলে, ‘১০ নভেম্বর’ তখন ‘শোক দিবসে’ রূপ নিতো না। এটা সাধারণ উপলদ্ধি থেকে বলা চলে।

(৬)

লারমার অকাল মৃত্যুতে ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল তার সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে ভাবাবেগ তাড়িত বক্তব্য (১০ নভেম্বর ’৮৩ সংকলন) যতটা পাওয়া যায়, ঘটনাবলীর বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ সেভাবে নেই বললে চলে।

পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তলিয়ে দেখলে এটা প্রকাশ পায় যে, ‘১০ নভেম্বর’ ছিল ঘটনা পরম্পরার পরিণতি, এটা রূঢ় শোনালেও অস্বীকার করা যাবে না। ‘৮৩ সালের ‘১৪ জুন’ অস্ত্রগুরু অমৃত লাল চাকমা (বলী ওস্তাদ) হামলায় মারা না গেলে, ‘১০ নভেম্বর’-এর মতো রক্তাক্ত বিষাদময় ঘটনা সংঘটিত হতো কিনা সে প্রশ্ন রয়ে যায়। ‘১৪ জুনের’ হামলার প্রতিশোধ নিতেই মরিয়া হয়ে প্রীতিগ্রুপ ‘১০ নভেম্বর’ হঠকারিতা করে বসে। পরিহাসের বিষয় এই, শত্রু  বিরুদ্ধে তারা দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনা করতে পারেনি।

বেদনাদায়ক হলেও ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে প্রধান বলি হলেন খোদ লারমা। সঙ্গতকারণে প্রশ্ন দেখা দেয়া স্বাভাবিক যে, ‘১৪ জুন’ হামলায় লারমার কতখানি সায় ছিল, তা তিনি অনুমোদন করেছিলেন কিনা?

‘লাম্বা-বাদি’ দ্বন্দ্ব উৎপত্তির পেছনে লারমার দায়-দায়িত্ব, দ্বন্দ্ব নিরসনে তার ভূমিকা, সীমাবদ্ধতা ও অন্যান্য দুর্বলতা নিয়ে কথা থাকলেও সামগ্রিক বিচারে তিনি ছিলেন একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক, জনগণের বিশ্বস্ত বন্ধু, সংগ্রামী নেতা এবং তার সমসাময়িকদের থেকে অগ্রণী। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জনগণের স্বার্থে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে লড়াই সংগ্রাম করেছেন এবং জীবনও দিয়েছেন—তার এই ভূমিকার কারণে লারমা স্মরণীয় ও সম্মানের আসনে আসীন হয়েছেন। তাকে কেউ খাটো করতে পারবে না, তিনি তার প্রাপ্য সম্মান পাবেন।

(৭)

লারমার মৃত্যু দিবসকে উপলক্ষ করে শোক ও শ্রদ্ধা জানানোর উছিলায় কেউ কেউ এমন ধরনের কার্যকলাপে মেতে উঠে, তা অশোভন, তাকে ইতরামি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এতে তারা একেত লারমাকে খাটো করছে, অন্যদিকে বড় ক্ষতি করছে পাহাড়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে।

এ পরিস্থিতিতে পুত্র শোকে কাতর এক কুকি-এর মত বলতে ইচ্ছে করে, ‘ওহ বন! ওইয়ে, আর ন কান্দ!’ অর্থাৎ ‘হে দোস্ত! যথেষ্ট হয়েছে, আর কেঁদো না!!’

এ রকম একটি ঘটনা হচ্ছে এই, এক কুকি একদিন তার চাকমা বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যায়। বন্ধুর বাড়িতে গেলে দেখতে কুকি লোকটি দেখতে পায়, তার বন্ধুটি পুত্র শোকে বিমর্ষ ও ক্রন্দনরত। কুকি লোকটিও বন্ধুর শোকে কাতর হয়ে মনের গভীর বেদনা থেকে সমবেদনা জানায়, কেঁদে শোক প্রকাশ করে।  আরেক সময় কুকিপাড়ায় চাকমা বন্ধুটি বেড়াতে যায়, গিয়ে দেখতে পায় পুত্র মারা যাওয়ায় কুকি লোকটিও শোকে কাতর।

কুকিকে সমবেদনা জানাতে চাকমা লোকটিও কান্না জুড়ে দেয়। দুই বন্ধু মিলে কান্নাকাটি করে শোক প্রকাশ করে যাচ্ছিল। শুধু কান্নায় শোক-সমবেদনা প্রকাশ যথেষ্ট মনে না হওয়ায়, চাকমা বন্ধুটি সমবেদনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কুকি বন্ধুটির রান্নার চুলা, হাঁড়ি-পাতিলও ভাঙতে শুরু করে। অতি সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত কুকিদের হাঁড়ি-পাতিল ভিন্ন অন্য কোনো মূল্যবান সরঞ্জামও থাকে না, তা তাদের প্রয়োজনও নেই।  নিজ বাড়ির হাঁড়ি-পাতিল গৃহস্থালী সম্পদ ক্ষতি হচ্ছে উপলদ্ধি করতে পেরে সরল প্রকৃতির কুকি লোকটি নিজে কান্নাকাটি বন্ধ করে এবং তার দোস্ত চাকমাকেও শোক প্রকাশ থেকে বিরত রাখতে উদ্যোগী হয়। কুকিটি মনের গভীর থেকে চাকমা বন্ধুটিকে বলে, ‘ওহ বন! ওইয়ে, আর ন কাঁন্দ!’ অর্থাৎ ‘হে দোস্ত! যথেষ্ট হয়েছে, আর কেঁদো না!!’ নিজ গৃহে ক্ষয়-ক্ষতি হয় এমন কোন কাজ সরল প্রকৃতির কুকি করে না, অন্যদেরও এ থেকে বিরত করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে যে, সহজ সরল কুকি লোকটির মতো পাহাড়িদেরও আত্মউপলদ্ধি করতে হবে। আন্দোলনে যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে!!! হিতাকাঙ্ক্ষীবেশী বিভিন্ন সংগঠন-সংস্থার লোকজন যারা ‘১০ নভেম্বর’- উপলক্ষে লোকদেখানো দরদ দেখায় ও নানা তৎপরতা চালায়, তারা প্রকারন্তরে জনগণকে আন্দোলনবিমুখ ও শাসকগোষ্ঠীর অনুগ্রহভাজন করে রাখার আয়োজন করে থাকে। এদের ব্যাপারে সাবধান না হলে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা যত তাড়াতাড়ি এ উপলদ্ধি করে পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে, ততই তা হবে জনগণের জন্য মঙ্গল। পরিশেষে, ক্ষতিগ্রস্ত কুকির ‘ওহ বন! ওইয়ে, আর ন কাঁন্দ!’–এ বিখ্যাত উক্তি ধার করে  “লারমার অনুসারীদের” মিনতি করে বলতে চাই, “দোহাই! এবার রেহাই দাও! আর যাই করো, তোমরা আর শোক পালন করো না”!!! #

[1] চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হলে ২০৫ (পূর্ব) কক্ষে ১৯৮৫ সালের ১০ নভেম্বর লারমার স্মরণে প্রথম স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার উদ্যেক্তার ভূমিকায় ছিলেন প্রসিত খীসা। তাকে আন্তরিকভাবে সহায়তা দিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন শিবাশীষ চাকমা, দেবপ্রসাদ দেওয়ান, নির্মল কান্তি চাকমা, দয়াল কৃষ্ণ তালুকদার, জটিল বিহারী চাকমা ও ভবেশ চাকমা। সিনিয়র ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন অরুণেন্দু  ত্রিপুরা (রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদে কর্মরত), শিশির চাকমা (রাঙ্গামাটিতে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক) ও মঙ্গল কুমার চাকমা (বর্তমান জেএসএস নেতা), ২০৫ (পূর্ব) কক্ষটি ছিল তার নামে বরাদ্দ। তিনি তখন মাস্টার্সের শেষ বর্ষের ছাত্র।উক্ত স্মরণ সভার সংবাদ গোয়েন্দার সংস্থার নিকট পৌঁছলে, তখন থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর নজরদারি বেড়ে যায়। 


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।


সিএইচটি নিউজের ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.