ফিরে দেখা ২০২০

২০২০ সালে পাহাড়ে আলোচিত দুই ঘটনা: খাগড়াছড়িতে গণধর্ষণ ও চিম্বুকে পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণ

0
235
খাগড়াছড়িতে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারীকে গণধর্ষণ ও ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ৭ আসামি। ফাইল ছবি

সিএইচটি নিউজ ডেস্ক ।। ২০২০ সালে পাহাড়ে বিচার বহির্ভুত হত্যা, খুন-অপহরণ, অন্যায় ধরপাকড়, নির্যাতন-হয়রানি, ভুমি বেদখল, নারী নির্যাতন, বাড়ি বাড়ি তল্লাশিসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বছরজুড়েই এ ধরনের ঘটনা চলমান ছিল। তবে এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে খাগড়াছড়িতে এক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী পাহাড়ি নারীকে ৯ জন সেটলার কর্তৃক গণধর্ষণ ও চিম্বুক পাহাড়ে ম্রোদের জমি জবরদখল করে সেনা কল্যাণ ট্রাস্ট ও সিকদার গ্রুপের পাঁচতারকা হোটেল ও বিলাবহুল পার্কসহ পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের ঘটনাটি। এ দু’টি ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ব্যাপক আন্দোলন সংগঠিত হয়।

খাগড়াছড়িতে গণধর্ষণের ঘটনাটি ঘটে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ দিবাগত রাত ২টার সময়। এ সময় ৯ জন সেটলার বাঙালি সংঘবদ্ধভাবে খাগড়াছড়ি সদরের গোলাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন বলপিয়ে আদাম নামক গ্রামের বাসিন্দা বিন্দু লাল চাকমার বাড়িতে প্রবেশ করে বাড়ির লোকজনকে এক কক্ষে বেঁধে রাখে এবং ওই প্রতিবন্ধী নারীকে আরেক কক্ষে নিয়ে হাত-পা ও মুখ বেঁধে দিয়ে পাশবিক কায়দায় পালাক্রমে ধর্ষণ করে এবং বাড়ির স্বর্ণালঙ্কারসহ ডাকাতি করে ভোরের দিকে পালিয়ে যায়।

পরদিন এ ঘটনা জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিবাদ দেখা দেয়। ঘটনার পরদিন ভিকটিম ওই নারীকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে অজ্ঞাত ৯ জনকে আসামি করে থানায় ধর্ষণ ও ডাকাতির ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়। এরপর এ ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু হলে প্রশাসনের টনক নড়ে। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঘটনায় জড়িত ৭ জনকে গ্রেফতার করে। তবে এখনো ঘটনায় জড়িত অপর ২ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। উক্ত ঘটনায় আটককৃত আসামিরা হলেন- হলেন- মো. আমিন (৪০), বেলাল হোসেন (২৩), ইকবাল হোসেন (২১), আব্দুল হালিম (২৮), শাহিন মিয়া (১৯), অন্তর (২০) ও আব্দুর রশিদ (৩৭)। তাদের বাড়ি খাগড়াছড়ির রামগড়, গুইমারা, মাটিরাঙ্গা ও খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায়।

এ ঘটনার প্রতিবাদেখাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। উল্লেখ্য যে, খাগড়াছড়ির উক্ত ঘটনার পরই দেশে আরো বেশ কয়েকটি লোমহর্ষক গণধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে সিলেটের এমসি কলেজে এক গৃহবধুকে ছাত্রলীগের দুর্বৃত্ত কর্তৃক গণধর্ষণ এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও দেশবাসীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ফলে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশ প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে। দলমত নির্বিশেষে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংগঠিত করে। পাহাড় ও সমতলে নারী নির্যাতন ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ নামে একটি প্লাটফর্ম গঠিত হয়, যারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

ধর্ষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলনের ফলে সরকার নারী ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করে আইন সংশোধন করে।

খাগড়াছড়ির উক্ত গণধর্ষণের ঘটনায় গত ১৭ ডিসেম্বর পুলিশ ৯ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। যা ১৮ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ সুপার আবদুল আজিজ জানান। অভিযোগপত্রে ২ জনকে পলাতক এবং একজনকে নাবালক হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে উক্ত ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হবে কিনা তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দূর হয়নি।

অন্যদিকে বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে ম্রোদের জমি জবরদখল করে সেনা কল্যাণ সংস্থা ও সিকদার গ্রুপ কর্তুক পাঁচতারকা হোটেল ও বিলাবহুল পার্কসহ পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের ঘটনাটি ২০২০ সালে ব্যাপক আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়।

চিম্বুক পাহাড় পাঁচতারকা হোটেল ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের প্রাতিবাদে ম্রো জাতিসত্তাদের কালচারাল শোডাউন। ৮ নভেম্বর ২০২০। ফাইল ছবি

এটি ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে ৮ নভেম্বর ২০২০ ম্রো জনগোষ্ঠীর একটি কালাচারাল শোডাডাউন ও প্রতিবাদ সমাবেশের মাধ্যমে। এ সমাবেশে শত শত ম্রো তাদের ঐতিহ্যবাহী বাশিঁ ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হন এবং চিম্বুক পাহাড় বেদখলের প্রতিবাদ জানান। অবশ্য এর আগে ৭ অক্টোবর ম্রো জাতিসত্তার জনগণ চিম্বুক পাহাড়ে ভূমি বেদখল বন্ধের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। এতে তারা ম্রোদের বংশপরম্পরায় ভোগদখলকৃত জুমের জমি, শ্মশানসহ অন্তত ৮০০-১০০০ একর জমি বেদখল ও তাদেরকে উচ্ছেদ করার চক্রান্তের কথা জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে ছোটখাটো প্রতিবাদ সংঘটিত হলেও ম্রোদের উক্ত কালচালার শোডাউনের মাধ্যমে চিম্বুক পাহাড় দখলের ঘটনাটি সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

চিম্বুক পাহাড়ে ম্রোদের জমি বেদখল করে পাঁচতারকা হোটেলসহ পর্যটনস্থাপনা নির্মাণ প্রকল্প বন্ধের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। উক্ত প্রকল্প বন্ধের দাবি জানিয়ে দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ, সিএইচটি কমিশনসহ বিভিন্ন সংগঠন সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ম্রোদের জমি বেদখলের উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রকল্পটি বন্ধের দাবি জানিয়ে পার্বত্য মন্ত্রী বীর বাহাদূরকে চিঠি প্রেরণ করে। এ নিয়ে দেশের পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ায় ব্যাপক লেখালেখি হয়। ফলে চিম্বুক পাহাড় রক্ষার যে আন্দোলন তা ব্যাপক আন্দোলনে রূপ নেয়।

চিম্বুক পাহাড়ে পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে তিন পাহাড়ি সংগঠনের বিক্ষোভ। ১৩ নভেম্বর ২০২০। ফাইল ছবি

দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলনের ফলে বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা ২২ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে প্রকল্পটির পক্ষে সাফাই গেয়ে এক মনগড়া বক্তব্য প্রদান করেন। যদিও তার বক্তব্য ম্রো জাতিসত্তাসহ দেশবাসী গ্রহণ করেননি।

চিম্বুক পাহাড়ে পাঁচতারকা হোটেলসহ পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার পরও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেনা কল্যাণ ট্র্রাস্ট ও সিকদার গ্রুপ প্রকল্পটি বাতিল করেনি। সরকারও এ প্রকল্পটি বন্ধের কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে ম্রো জনগোষ্ঠীর বংশপরম্পরায় ভোগদখলকৃত জমি ও বসতভিটা রক্ষা পাবে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই গেছে।

 


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.