পঞ্চম পর্ব

ইউরোপের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলসমূহ

0
1

উবাই মারমা

পঞ্চম পর্ব
ইউরোপের কয়েকটি দেশের স্বায়ত্তশাসিত এলাকা সম্পর্কে এখানে ধারাবাহিকভাবে যে আলোচনা করা হচ্ছে আজকে তার পঞ্চম পর্বে যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ড।

স্কটল্যান্ড, যুক্তরাজ্য
৭৮,৭৮২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত স্কটল্যান্ডের জনসংখ্যা ৫০,৬২,০১১ জন (২০০১ সালের পরিসংখ্যান )। রাজধানীর নাম এডিনবার্গ, সরকারী ভাষা ইংরেজী এবং গ্যালিক (Gaelic )। যুক্তরাজ্যের সরকারী নাম হলো ইউনাইটেড কিংডম অব গেট ব্রিটেন এন্ড নর্দান আয়ারল্যান্ড, এবং দেশটি ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড সমন্বয়ে গঠিত। যুক্তরাজ্য এমন একটি ইউনিয়ন যা তার দু’টি অঙ্গ স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসকে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছে এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির মাধ্যমে উত্তর আয়ারল্যান্ড ও ক্ষুদ্র Isle of Man  এর সাথে আধা ফেডারেল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে।Scotland map

যুক্তরাজ্যে স্কটল্যান্ড একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রাজ্য। ইংল্যান্ড ও ওয়েলস-এর উত্তরে যে সব বৃটিশ অধিকারভুক্ত দ্বীপ রয়েছে স্কটল্যান্ড সেগুলোর সর্ব উত্তরে অবস্থিত। স্কটল্যান্ড ১৭০৭ সালের এ্যাক্ট অব ইউনিয়ন দ্বারা ইংল্যান্ড এবং ওয়েলস-এর সাথে যুক্ত হয়। এই আইন বলে স্কটল্যান্ড আলাদা আইন ব্যবস্থা ধরে রেখেছে; নিজস্ব চার্চ ও ব্যাংক গঠন করেছে; বৃটিশ সংসদে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন লাভ করেছে; স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রম বিষয়ে স্বশাসন ( হোমরুল ) প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তার নিজস্ব পতাকা ও মুদ্রা রয়েছে।

১৯৩৯ সাল থেকে এডিনবার্গ ও লন্ডনে অবস্থিত দু’টি স্কটিশ অফিস স্কটল্যান্ডের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। স্কটিশ অফিস হলো স্কটল্যান্ড বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগ। স্কটিশ অফিসের অধীনে স্কটল্যান্ড আলাদা বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা ও রেডিও সার্ভিস পরিচালনা করে। তবে অধিকাংশ অর্থনৈতিক নীতি সংক্রান্ত বিষয়াদি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ যুক্তরাজ্যের সংসদে গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৮ সালে ওয়েস্টমিনস্টার সংসদ স্কটল্যান্ড বিল পাস করে, যেখানে এডিনবার্গে সরাসরি ভোটে নির্বাসিত সংসদ প্রতিষ্ঠা বিষয়ে স্কটল্যান্ডে গণভোটের বিধান রাখা হয়। ১৯৭৯ সালে একই সাথে ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। স্কটল্যন্ডে মাত্র ৩৩% ভোটার ক্ষমতা হস্তান্তরের (devolution) পক্ষে ভোট দেন। আইনটি পাসের জন্য কম পক্ষে ৪০% ডেভোলিউশনের পক্ষে ভোট পড়ার দরকার ছিল। অপরদিকে ওয়েলস-এ ২০% ভোটার ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে ভোট দেন।

১৯৮৭ সালে বৃটিশ সংসদে স্কটিশ ও ওয়েল-এর সদস্যরা নিজেদের মধ্যে সংসদীয় ঐক্য গঠন করে- উদ্দেশ্য ছিলো স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস-এ সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের পথ গ্রহণে বাধ্য করা। স্কটিশ ও ওয়েলস-এর প্রতিনিধিরা তাদের সাংবিধানিক দাবি আদায়ের জন্য এক সাথে কাজ করতে রাজী হন। এই দাবিগুলো ছিল- স্কটল্যান্ডের জন্য স্বাধীনতা, আর ওয়েলস-এর জন্য স্বশাসিত সরকার। ১৯৯০ সালের অক্টোবরে স্কটল্যান্ডে একটি সাংবিধানিক কনভেনশনের আয়োজন করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাজ্যের মধ্যে স্কটিশ সংসদের জন্য সাধারণ পরিকল্পনার রূপরেখা প্রণয়ন করা। ১৯৯৭ সালে গণভোট আইন (স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস) এর অধীনে ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস-এ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। স্কটল্যান্ডের ৭৪.৩% ভোটার ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে ও ২৫% বিপক্ষে ভোট দেন।

এরপর ১৯৯৮ সালে স্কটল্যান্ড এ্যাক্ট পাস হয়। এর ফলে ১৭০৭ সালের পর প্রথম বারের মতো স্কটল্যান্ডের জন্য একটি স্বতন্ত্র সংসদ গঠনের পথ উন্মুক্ত হয়। একই সময়ে ওয়েলসবাসীদের নিজস্ব বিষয়ে অধিকতর নিয়ন্ত্রণ প্রদানের জন্য ওয়েলস এ্যাসেমব্লি গঠিত হয়। স্কটল্যান্ড এ্যাক্ট মোতাবেক স্কটিশ সংসকে বহু বিস্তৃত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া হয়। সংসদটি এক কক্ষ বিশিষ্ট এবং ১২৯  জন সদস্য নিয়ে গঠিত। পার্লামেন্ট সদস্যদের মধ্য থেকে একজন ফার্স্ট মিনিস্টার নির্বাচিত হন, যাকে রাণী নিয়োগ দেন। ফার্স্ট মিনিস্টার নির্বাহী বিভাগের প্রধান। এই বিভাগ সরাসরি নির্বাচিত স্কটিশ সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। স্কটিশ সরকারের যেসব বিষয়ে ক্ষমতা রয়েছে সেগুলো হলো- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, সামাজিক কার্যক্রম, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অধিকাংশ দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন এবং ফৌজদারী বিচারসহ আইন ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, পরিবেশ, কৃষি, খেলাধূলা ও পরিসংখ্যান। যুক্তরাজ্যের হাতে যে সব বিষয়ে ক্ষমতা সংরক্ষিত রয়েছে সেগুলো হলো ইউরোপের সাথে পররাষ্ট্র নীতি, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, যুক্তরাজ্যের পণ্যের সাধারণ বাজার , চাকুরী সংক্রান্ত বিধি বিধান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পরিবহনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত রেগুলেশনের অধিকাংশ দিক।

বৃটিশ হাউজ অব কমন্সে (অর্থাৎ বৃটিশ সংসদে) স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন আসন থেকে ৫৯ জন এমপি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তারা সংসদে স্কটল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেন। যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী সভায় স্কটল্যান্ড বিষয়ক একজন মন্ত্রী রয়েছেন। স্কটিশ সংসদ হস্তান্তরিত কোন বিষয় ওয়েস্টমিনস্টারে আবার ফেরত পাঠাতে পারে উক্ত বিষয়ে পুরো যুক্তরাজ্য ব্যাপী আইন প্রণয়নের জন্য। স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ইংল্যান্ডের রাণী এর রাষ্ট্র প্রধান। স্কটিশ সংসদ ১৯৯৯ সালে প্রথম নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০০ সাল থেকে পুরো মাত্রায় ক্রিয়াশীল। স্কটল্যান্ডে ক্ষমতা হস্তান্তরকে যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়। এই ক্ষমতা হস্তান্তরের ফলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সরকার উন্মুক্তকরণ, সংসদকে সংস্কার ও ব্যক্তির অধিকার বর্দ্ধিত করা সম্ভব হয়েছে।

২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টে¤র স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার উপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ৫৫ শতাংশ বৃটেনের সাথে থাকার পক্ষে ও ৪৫ শতাংশ বিপক্ষে ভোট দেন। এ বছর জুনে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত ব্রেক্সিট ভোটের পর (অর্থাৎ যুক্তরাজ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপর গণভোট) স্কটল্যান্ডে আবার ইন্ডিপেন্ডেন্স রেফারেন্ডাম বা স্বাধীনতা বিষয়ে গণভোটের কথা নতুন করে শোনা যাচ্ছে। উল্লেখ্য এই গণভোটে যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলেও স্কটল্যান্ডবাসীরা ব্যাপকভাবে ইইউতে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।

সূত্র: 1. Autonomy, Sovereignty, and Self-determination, Revised Edition (1996 ) by Hurst Hannum

  1.  The Working Autonomies in Europe by Thomus  Benedikter.
  2. 3.https://en.wikipedia.org/wiki/Scottish_independence_referendum,_2014
    ————————–
    সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.